শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ২০:৩৫
ইরানের খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে?

ইরানের নতুন খোররামশাহর-৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ব্যয় ও ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পরিচালিত একটি নতুন ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি উদ্বোধনের সময় খোররামশাহর-৪—যা অপারেশনাল নামে “খায়বার” নামেও পরিচিত—এই গোপন নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান অস্ত্রব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

ইরানি গণমাধ্যমের মতে, শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোর মধ্যে এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ফলে এটি কেবল ঘোষিত সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং একটি স্থায়ী ও টেকসই কার্যকর অস্ত্রব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। কৌশলগতভাবে এর অর্থ হলো—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী শত্রুর প্রথম আঘাত সহ্য করেও এমনকি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপের মধ্যেও দ্রুত পাল্টা হামলা চালাতে সক্ষম থাকবে।

খোররামশাহর-৪ ইরানের ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এর কার্যকর পাল্লা প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার এবং এটি উচ্চ ওজনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। অত্যন্ত উচ্চগতির কারণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সতর্কতা ও প্রতিরোধের সময় অনেক কমে যায়। আধুনিক গাইডেন্স সিস্টেম, বিশেষ ফ্লাইট প্রোফাইল ও গতির সমন্বয়ে এটি স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার ক্ষমতা রাখে।

দ্বিতীয় আঘাতের সক্ষমতা ও কৌশলগত বার্তা
খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রকে ভূগর্ভস্থ উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা ইরানের “দ্বিতীয় আঘাত” (second-strike) দেওয়ার সক্ষমতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক নিরাপত্তা হুমকির প্রেক্ষাপটে এই উন্মোচনের সময় নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে ক্ষেপণাস্ত্রটি এখন ইরানের “সক্রিয় প্রতিরোধ” নীতির একটি কার্যকর অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সামরিক সক্ষমতার প্রকাশ সাধারণত কূটনৈতিক চাপের সময়ে দরকষাকষির শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে ইরান এই বার্তাই দিতে চায় যে আলোচনায় তারা দুর্বল অবস্থান থেকে অংশ নেয় না এবং সামরিক অভিযানের মূল্য আগের তুলনায় অনেক বেশি।

খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
২০২৩ সালের ২৫ জুন প্রথম উন্মোচিত খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ মিটার, ব্যাস ১.৫ মিটার এবং ওজন প্রায় ৩০ টন। এটি প্রায় ১,৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের ভারী ওয়ারহেড বহনে সক্ষম—যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের অন্যতম শক্তিশালী ধ্বংসক্ষমতা সম্পন্ন অস্ত্র।

ক্ষেপণাস্ত্রটি উন্নত “আরভান্দ” ইঞ্জিন দ্বারা চালিত এবং হাইপারগলিক তরল জ্বালানি ব্যবহার করে, যা দ্রুত উৎক্ষেপণ প্রস্তুতি নিশ্চিত করে। নকশাগত একটি বড় উদ্ভাবন হলো ইঞ্জিনকে জ্বালানি ট্যাংকের ভেতরে স্থাপন করা—যা কাঠামোগত স্থিতিশীলতা বাড়ায়, ক্ষেপণাস্ত্রের দৈর্ঘ্য কমায় এবং নির্ভুলতা উন্নত করে।

গতি ও প্রতিক্রিয়া সময় হ্রাস
খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র বায়ুমণ্ডলের বাইরে সর্বোচ্চ মাক ১৬ এবং ভেতরে প্রায় মাক ৮ গতিতে চলতে সক্ষম। আনুমানিক ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে এটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে—ফলে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতিক্রিয়ার সময় অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে।

ক্ষেপণাস্ত্রটি তিন ধাপে উড্ডয়ন সম্পন্ন করে: প্রাথমিক বুস্ট ও পথ নির্ধারণ, মধ্যবর্তী পর্যায়ে ওয়ারহেড বিচ্ছিন্ন হয়ে গতিপথ সংশোধন, এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানা।

ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধক্ষমতা
ক্ষেপণাস্ত্রটিতে ম্যানুভারেবল রিএন্ট্রি ভেহিকল (MaRV) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সহায়ক ইঞ্জিনের মাধ্যমে দিক পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের পর ইলেকট্রনিক গাইডেন্স ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ায় শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ কৌশল কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

রাডার শনাক্তযোগ্যতা ও উচ্চ নির্ভুলতা
প্রচলিত ফিন বাদ দিয়ে থ্রাস্ট ভেক্টর কন্ট্রোল ব্যবস্থার ব্যবহার ক্ষেপণাস্ত্রটির রাডার শনাক্তযোগ্যতা কমিয়েছে এবং ম্যানুভার করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ পাল্লায় এর ত্রুটিসীমা (CEP) মাত্র প্রায় ৩০ মিটার—যা এর ধ্বংসক্ষমতাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে।

দ্রুত প্রস্তুতি ও বহুমুখী আঘাতের সক্ষমতা
জ্বালানি ট্যাংকের ধাতব সংকর ও জ্বালানি মিশ্রণে উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণযোগ্যতা বাড়ানো হয়েছে। মোবাইল প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণ সম্ভব হওয়ায় প্রস্তুতির সময় ১৫ মিনিটেরও কম বলে জানা গেছে।

আইআরজিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি মাত্র খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তু এলাকায় একাধিক আঘাত হানতে সক্ষম—যা যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে।

কৌশলগত তাৎপর্য
ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ভেতরে খোররামশাহর-৪ উন্মোচন আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার সক্ষমতা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং গোপন মোতায়েন ব্যবস্থা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে খোররামশাহর-৪ কেবল একটি অস্ত্র নয়—বরং একটি কৌশলগত বার্তা। এটি ইরানের সেই নীতিকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে স্থিতিশীলতা, প্রস্তুতি এবং নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার মাধ্যমে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha